রাজনীতি ও ছাত্রসমাজ

হুমায়ুন কবিরঃ শিক্ষা মানুষের সাংবিধানিক অধিকার। শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। যথাযথ শিক্ষার অভাবে দেশ হবে মেরুদণ্ডহীন।শিক্ষার্থীদের সাথে শিক্ষাকেন্দ্রর সম্পর্ক নিবিড়। তাই শিক্ষাকেন্দ্র হতে হবে নিখুঁত মনোরম এবং অপরাজনীতি মুক্ত।

শিক্ষার্থীরা দেশের প্রাণ। শিক্ষার্থী থাকলে দেশ থাকবে। সরকার তাই শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে বই সহ শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করে থাকে। ছাত্রদের থেকেই উঠে আসে দেশের সর্বস্থরের পেশাজীবী মানুষ। মেধাবীরা দেশের স্তম্ভ। তাদের থেকে উঠে আসে বুদ্ধিজীবী, ডাক্তার, বিচারক, ইঞ্জিনিয়ার ও রাষ্ট্রনায়ক।

এক সময় ছাত্ররাজনীতি ছিলো দেশের মানুষের অধিকার আদায়ে প্রধান হাতিয়ার। দেশ ও দেশের মানুষের অধিকার রক্ষার আন্দোলনের ভিত গড়ে দিতো ছাত্ররাই। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, ছাত্রদের সেই রাজনীতি এখন আর নেই। বর্তমান ছাত্র রাজনীতি ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে আসছে গুন্ডা-বদমাইশ, ডাকাত, ধর্ষক এবং ইভটিজার। তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে অপরাজনীতি মুক্ত করতে হবে । আবরারকে যে বা যারা মারুক দেশের একজন মেধাবীকেই মেরেফেলা হয়েছে। এটা অবশ্যই ছাত্রদের অপরাজনীতির কারণেই হয়েছে।

ছাত্রদেরকে এই অপরাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তাদেরকে ছাত্র রাজনীতির সেই সোনালী যুগে ফিরে যেতে হবে। যেই রাজনীতি করে নতুন একটি দেশের স্বপ্নদ্রষ্টা হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন জাতির বীর সন্তান। তিনি ছাত্রাবস্থায় ন্যায়ের জন্য লড়েছেন। মানুষের অধিকারে জন্য কারাবরণ করেছেন। জীবনের সোনালী সময় গুলো মানবতার জন্য ব্যয় করেছেন। তাঁর ছাত্রজীবনের রাজনীতি থেকে আজকের শিক্ষার্থীরা অনুপ্রাণিত।দেশের জন্য আত্মত্যাগ, দেশপ্রেম, মানবপ্রেম এসব গুনাবলী ছাত্রজীবন থেকে অনুশীলন করতে হয়, বঙ্গবন্ধু সেটা শিখিয়ে গেছেন।

কেউ যদি ছাত্রজীবনে স্বচ্ছ রাজনীতি শিখতে চায় সে যেন বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবন, অসমাপ্ত জীবনী বা ছাত্রজীবন পড়ে নেয়। আমরা দূর্ভাগা জাতি, তাই তিনি আমাদের মাঝে আজ নেই। কিন্তু তাঁর অসমাপ্ত জীবনী আমাদের কাছে আছে। আমরা তাঁর সম্পর্কে জানার জন্য মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক বই পড়তে পারি। পড়তে পারি অন্থিনির লেখা ‘বাংলাদেশ রক্তের ঋণ’ বইটি । এসব বই পড়ে আমরা বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্ব ও মানবীয় গুনাবলীর কথা জানতে পারি। তিনি তাঁর পুরো জীবনে হতদরিদ্র মানুষের পাশে দাড়াতেন, অসহায় মানুষের সহযোগিতা করতেন। আজ অসহায় ও হতদরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো মত ছাত্ররাজনীতি দেখাই যায় না। এখন ছাত্ররাজনীতি জন্ম দিচ্ছে দেশদ্রোহী, চোর, ডাকাত, টেন্ডাবাজ, চাঁদাবাজ, দখলবাজ, ইভটিজার, খুনী, মাতাল ও ধর্ষক। মানবতার কোন গুনাবলীই তাদের মাঝে দেখা যায় না এখন। আইন হাতে তুলে নেওয়ার মত গর্হিত কাজ এখন তারা করছে। তারা এখন প্রকাশ্যে মানুষ খুন করছে, প্রকাশ্যে ইভটিজিং করছে, শিক্ষকদের গায়ে হাত তুলছে, চাঁদাবাজি করছে। হলে সীটের জন্য শিক্ষকদের হুমকি দিচ্ছে। যে সব কাজ রাস্তার টোকাইদের করার কথা সে সব কাজ এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মত পবিত্র স্থানে শিক্ষার্থীরা করছে। শিক্ষার্থীরা এইসব কাজ করার সাহস পাচ্ছে কারণ তারা রাজনৈতিক আশ্রয় পায়।

ছাত্র রাজনীতি আজকের বিদ্যালয় গুলোতে খুনাখুনি, ধর্ষণ, রেগিং এর জন্ম দিচ্ছে। খুন হচ্ছে মেধাবী ছাত্ররা, খুন হচ্ছে জাতির ভবিষ্যত। শিক্ষকরা আছেন দফায় দফায় বেতন বাড়ানো আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের দাবী নিয়ে। প্রীতিলতা ও সূর্যসেনরা কই? তারা তো দেশকে বেশি ভালোবেসেছেন, দেশের জন্যই জীবনের মূল্যবান সময় দিয়েছেন, তারা দেশের প্রয়োজনে নিজেকে উৎস্বর্গ করছেন। লেখক, কন্ঠশিল্পী, নৃত্যশিল্পী, কলাশিল্পী, সংবাদিক, চলচিত্র নির্মাতা সবাই তো আছে কিন্তু জহির রায়হান, মনির চৌধুরী,এস.এম. সুলতান, মিশুক মনির নেই, তারেক মাসুদরা আর তৈরী হচ্ছে না।

আজ ছাত্রদের নিয়ে ভাববে কে? সরকার চাইলেই সবকিছু করতে পারেন, সেটা গত ১২ বছরে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। ছাত্রসমাজ বাঁচলে দেশ বাঁচবে। দেশ বাঁচলে বঙ্গবন্ধু সহ শহীদদের আত্মা শান্তি পাবে। মুক্তিযোদ্ধারা আরো গৌরবান্বিত হবেন, সর্বোপরি এই দেশ সোনার বাংলায় রূপান্তরিত হবে।

বর্তমানে ছাত্র রাজনীতির ঘোলাজলে শিক্ষক ও ছাত্ররা মাছ শিকার করছে। সরকার শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার মান উন্নয়নে জন্য শিক্ষকদের চাপ দিচ্ছে, অন্যদিকে সমান তালে শিক্ষকরা বেতন বাড়ানো আর চাকরি জাতীয়করণের জন্য সরকারকে চাপ দিয়ে মিছিল মিটিং ও জনসভা করছে।

এদিকে ছাত্ররাও অপরাজনীতিতে জড়িয়ে খুন, ধর্ষণ, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, ডাকাতি, ইভটিজিং মাদক গ্রহণ থেকে শুরু করে সবধরনের অনৈতিক কাজে আসক্ত হয়ে গেছে।তারা ছাত্রজীবন থেকে পয়সা কামিয়ে টাকাওয়ালা হওয়ার ধান্দাই নেমেছে । এটা জাতির জন্য অশনি সংকেত। ছাত্ররা খুন করছে, আবার নিজেরাই ঐ ভিডিও রেকর্ড করাচ্ছে। আইনের কোন তোয়াক্কাই নেই, আইন তাদের আটকিয়েও রাখতে পারছে না, যেকোন ভাবেই রাজনৈতিক আশ্রয়ে তারা পার পেয়ে যাচ্ছে।

এমন চলতে থাকলে একদিন চারদিকে নেমে আসবে অন্ধকার। সুতারাং আজকের ছাত্র তথা দেশের ভবিষ্যতে প্রজন্মকে রক্ষায় ছাত্র রাজনীতিকে অপরাজনীতির হাত থেকে রক্ষা করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

আরও পড়ুন

Comments are closed.