একটি ঝরা শিউলি

তাইয়্যেবা ইসলামঃ
১.
“আব্বা আমি লেহাপড়া করুম, আমারে বিয়া দিও না”
ময়না শেষ বারের মতো হেঁচকি দিয়ে কেঁদে উঠে কথাটা বলে ফেললো! মজিদ মিয়া খেঁকিয়ে উঠে জবাব দিলেন
-চুপপপ যা কইছস আর যানি মুখ দিয়া না বাইর অয়। বেলা ভাটি হওন এর আগের পোলারা আইয়া পরবো, গেরস্ত পরিবার মেলা ধন সম্পদ বাড়িতে ৪ টা দুধের গাই ই আছে কহনো ভাতের অভাবে মরা লাগবো না।
বিদায় কালে অসহায় চোখে মায়ের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে ছিলো ময়না, কাজল লেপ্টে থাকা ভেজা চোখ দুটো যেন বলছিল “মা আমারে যাইতে দিও না, মাত্র তো তেরো আর কয়টা বছর তোমার বুকে যায়গা দাও”
রহিমা বেগম মুখে আচঁল টেনে অস্পষ্ট গলায় বললেন
-ভালা থাকিস মা, সবার মন জুগাইয়া চলিস।

২.
আজ দুইমাস ময়না শশুড়বাড়ি, দ্বিতীয় দিন দ্বিরাগমনে গিয়ে শাশুড়ির ইচ্ছার জন্য সেদিন রাতেই ফিরে আসতে হয়েছিল। শাশুড়ি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন খুব দরকার ছাড়া বাপের বাড়ি যাওয়া নিষেধ। সদ্য ষষ্ঠ শ্রেণীতে উঠা একটা ক্ষুদ্র প্রাণ মায়ের কথা মতো বই কলম ছেড়ে এখন সবার মন যোগাতে ব্যস্ত! কখনো স্বামীর, কখনো শশুড়, শাশুড়ি বা ননদের।
সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে গোসল করার জন্য কল চাপে ময়না, প্রথম প্রথম খুব লজ্জা পেলেও এখন মানিয়ে নিয়েছে। কারণ গোসল করতে বেলা হয়ে গেলে শাশুড়ি মা অপমানের বেলায় একচুল ও ছাড় দেন না। গোসল শেষে ভেজা গামছায় চুল পেঁচিয়ে রশিতে কাপড় ছড়িয়ে দিতে দিতে সকালে কাজ গুলো আবারও মনে মনে আওড়িয়ে নেয়। উঠান বাড়ি ঝাড়ু দিয়ে থালা বাসনের স্তুপ নিয়ে বসতে হয় কল পাড়ে। নতুন বউয়ের হাতের চুড়ির সাথে থালা বাসনের টুংটাং আওয়াজ কি অদ্ভুত ভায়োলিনের সুরের মতো শুনায়! ততক্ষণে শাশুড়ি মা জেগে যান, দাঁত মাজতে মাজতে কল পাড়ে এসে চেঁচিয়ে উঠে কাজে ভুল ধরতে কখনো পিছুপা হন না তিনি। ময়না ক্ষানিক হেসে শুধরে নেয় নিজেকে। উড়না পরতে গিয়ে হিমশিম খাওয়া মেয়েটা বড্ড ব্যস্ত হয়ে কোমরে কাপড় গুঁজে স্বামীর পাতে ধোয়া ছোটা ভাত বাড়তে হিমশিম খায়না। রশীদ কখনো কখনো সুযোগ বুঝে বউয়ের কোমর ছুঁয়ে দিতে ভুল করেনা, ময়না আঁতকে উঠে। কেনো যেন এ ছোঁঁয়ায় তার কষ্ট হয়! সারাদিন হাড় ভাঙ্গা খাটুনির পর যখন তার নিথর দেহ টার উপর থেকে একটা তৃপ্ত ক্লান্ত দেহ নেমে আসে তখন পাশ ফিরে শুয়ে চোখের জল ছুঁয়ে মুচকি হেসে বলে “এইতো জীবন “!
রশীদ মাঝে মাঝেই হাট থেকে ফেরার সময় ময়নার জন্য এটা ওটা আনে। সে বিপত্নীক পুরুষ ৪২ এর কোঠায় পা দিয়েও ১৩ বছর বয়সি বউ পেয়ে অখুশি নয়। লাল নীল ফিতা, সুগন্ধি তেল, কাঁচের চুড়ি, আলতার কৌটা, এক পাতা কালো টিপ, আর কাজলদানি টা বড্ড শখ করেই লুকিয়ে বউয়ের হাতে তুলে দেয় বেচারা। না লুকিয়ে উপায় নেই মায়ের সামনে বউ আদর দেখানোর মতো দুঃসাহস তার নেই। তার প্রথম স্ত্রী অনাদর অবহেলায় ই মরেছে।
আর বেচারি ময়নার ও ভাগ্য হয়না দিনের আলোয় একটু সেজে দেখার। রশীদের দেওয়া কাজলের কৌটা থেকে মোমবাতির আলোয় চোখে গাঢ় করে কাজল পরছে ময়না, আগুনের শিখা টা তার নাকফুলে প্রতিবিম্ব হয়ে যেন আরেক জ্বলন্ত লাভার রূপ নিয়েছে। তামাটে বর্নের মুখ অবয়ব টা মোমের আলোয় হঠাৎই খুব মায়াবী লাগছে, ময়না গভীর চোখে চেয়ে আছে বাহিরে! বেড়ার ফাঁক দিয়ে অমাবস্যার আকাশ টা কত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, দু’একটা তাঁরাও মেঘের ফাঁকে লুকোচুরি খেলছে।
ভেতর থেকে এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ময়না বিরবির করে বলে
” ইসস আমি যদি মুক্ত পাখি হইতাম তবে আঁধার না আলো টাই আমার হইতো ”
রশীদ কাপড়ের আঁচল সড়িয়ে ময়না কে কামভাবে আলিঙ্গন করে বললো
-ময়নামতি শুইবা না?
ময়না দাতে দাঁত চেপে শক্ত হয়ে থাকে উত্তর দেয় না, কারণ এই প্রশ্নের উত্তর টা সে কখনোই দিতে পারেনা!

৩.
সূর্য্য পশ্চিমে হেলে পুরো আকাশ টাকে লাল আভায় ভরিয়ে দিয়েছে, শিউলি তলাটা যেন এক দুধ আলতার থালা! কমলা সাদা রঙের ফুল গুলো বিছিয়ে আছে পুরো টা জুড়ে। এক সময় সকালে মকতবে যাওয়ার কালে উড়নার টোনা ভরে শিউলি কুঁড়িয়ে আনতো ময়না, আর সারা সকাল বসে মালা গেঁথে সে মালা চুলে পরে স্কুলে যেতো। দিন গুলো আজ সব অতীত, তবুও পরে থাকা ফুল গুলো খুব ধরতে ইচ্ছে করছে তার। বাড়ির আঙিনা মাড়িয়ে শিউলি তলায় যেতেই হরহর করে বমি করে দেয় ময়না, মাথাটা যেন চারদিকে চক্কর দিচ্ছে! দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি নেই! যখন বোধশক্তি ফিরে আসে তখন পাশেই দাদী শাশুড়ির আওয়াজ শুনতে পায়, তিনি হেসে হেসে বলছেন
“বউ আমাগো পোয়াতি! মাস তিনেক হইবো আরকি”!
ময়না নির্লিপ্ত চোখে চেয়ে থাকে সবার দিকে, সবাই রশীদ কে ধরে হাজার ঠাট্রা মশকরা করছে, চাচী দাদীরা চোখ টিপে কথা বলছে কিন্তু সেসবে কেন যেন কোন দুঃখ, লজ্জা, আনন্দ কিছুই হচ্ছেনা ময়নার!
নতুন নতুন মা হওয়ার আনন্দ সবাই কে গ্রাস করলেও রাতের বেলায় খেতে বসে শাশুড়ি মা ছেলের পাতে তরকারী দিতে দিতে বলেন
-ওর পেটের বাচ্চা কি আমাগো রশীদ? ১২ বছর জমিরনের লগে ঘর করছস জমিরন তো পোয়াতি হইলো না? নাকি কোন কুকাম কইরা পেট বাজাইছে?
মায়ের মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে রশীদ, উত্তর দেওয়ার সাহস নেই তার।
ময়না পাতে হাত ধুয়ে ক্ষানিক হেসে ঘরে গিয়ে দুয়ার দেয়, বাহির থেকে শাশুড়ি মায়ের অশ্রাব্য গালিগালাজে ময়না ডুঁকরে
কেঁদে উঠে! নিজের পেটে অনবরত চাপড় দিয়ে জিজ্ঞেস করে
– কেমন সন্তান তুই? তহন কইতে পারলি না যে তুই তোর বাপেরই কুকামের ফসল? কাঁদতে কাঁদতে কখন যে ঘুমিয়ে গেছে তার তোয়াক্কা নেই, পাশে চেয়ে রশীদ কে না পেয়ে কপাট খুলে দেখে কপাটের সামনে খড়ের স্তুপ দিয়ে বেভোরে ঘুমাচ্ছে রশীদ! আহা রে শীতের রাতে কতো কষ্টই না করেছে বেচারা! তারই বা দোষ কি মায়ের মুখের উপর প্রতিবাদ করতে পারে না সে। রশীদ কে ডেকে ঘরে নিয়ে এলো ময়না, রশীদ বিছানায় শুতে শুতে অপরাধী গলায় বললো
– মায়ের কথায় দুঃখ পাইয়ো না ময়না!
ময়না রশীদের কথার কোন উওর না দিয়ে কলসি কাঁখে দিয়ে পুকুরের উদ্দেশ্যে বের হয়ে পরলো। ভিরানো দরজা দিয়ে যতদূর দেখা যায় চেয়ে ছিলো রশীদ, একসময় ময়নার অবয়ব টা কুয়াশায় মিলিয়ে গেলো। রশীদ এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চোখ মুদলো!

৪.
ঢেঁকিতে ৫৫ তম পার দেওয়ার পর ময়না কাকুতির স্বরে কেঁদে উঠে বললো
– আম্মা আমি আর পারতাছিনা! আমারে ঘরে নিয়া চলেন! আমার ভিতরে সব ছিঁইড়া যাইতাছে! মনে হয় আর বাঁচমু না! -আট টার মা হইছি আমি তো আর বুঝি না না? যে কহন কিয়ের ব্যাথা উঠে । এতো এড়ায়া দিলে চলে না বুঝচ্ছো? সারা বাড়ির কাম কাজ কইরা ও মণের মণ ধান ভানছি গায়ে লাগে নাই। যাও যাও আর ধান ভানা লাগবো না তোমার!
শাশুড়ি মায়ের প্রবল তাচ্ছিল্যের কথা গুলো ও আজ ময়নার খারাপ লাগেনি, কোন রকম ঘরে গিয়ে বিছানায় পরে যায় ময়না।
সন্ধ্যা নাগাদ অবস্থা খুব খারাপের পর্যায়ে চলে গেলে রশীদ দৌঁড়ে গিয়ে ধাত্রীকে ডেকে আনে। সারা শরীর অকারণে নীল হয়ে যাওয়ায় অজানা আশংকায় শাশুড়ি মায়ের কপালেও বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠে। রশীদ একমনে আল্লাহর নাম জপতে থাকে।
ময়নার সারা শরীর ভারী হয়ে আসে, অসাড় দেহটা নাড়ানোর শক্তি হারিয়ে ফেলে সে। সারা শরীরের ঘামে বিছানা চুপসে যায়! চোখ মেলে চেয়েও কিছু আর স্পষ্ট নেই তার চোখে, ঝাপসা চোখে ধাত্রীকেও বেশ অপ্রস্তুত লাগে তার কাছে। বারবার মায়ের মুখটা মনে হচ্ছিলো, ইসসস মা যদি এসে হাত টায় ধরতো তবে মরণকষ্ট টাও ক্ষানিক লাঘব হতো। কষ্ট টা ক্রমে ক্রমে বাড়ছিলো! একটা ছোট গলায় কান্নার শব্দ আসছে কানে, বাহিরে হয়তো রশীদেরই গলা, আলহামদুলিল্লাহ বলে চিৎকার করছে সে! ইসস মানুষ টা কতো সহজসরল! পাশেই কেউ একজন বলছে “পোলা হইছে রে আজান দিতে ক”!
খুব ইচ্ছে করছে আমার ছোট প্রাণ টাকে দেখতে, কিন্তু হাজার চেষ্টায় ও চোখ মেলে রাখতে পারছিনা! সবার গলার স্বর আমার কানে ক্ষীন হয়ে আসছে! আমি পানি খাবো, খুব তেষ্টা আজ! কিন্তু অনন্তকালের ঘুম হয়তো আমায় আর ছাড়বেনা! চোখ দুটো বুজে আসছে! শরীরের সব শক্তি দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছি
তবুও মাথার পাশে দাঁড়িয়ে ছেলেটা কে বুকে নিয়ে অঝোরে কাঁদছে রশীদ! আর আমায় ডেকে বলছে
“ময়না কথা কও ! ও ময়না ময়নামতি চাইয়া দেখো তোমার পোলা কান্দে”!
সে কখন থেকে চিৎকার করে বলছি আমি এখানে কিন্তু শুনতে পাচ্ছেনা সে! হয়তো আর কেউ শুনবেনা কখনো! এ জন্মের মতো ঝরা শিউলি হয়ে হয়তো চলে গেলাম, কিন্তু এ যাওয়াই শেষ যাওয়া নয়
আমি এভাবে বার বার ঝরে যাবো হাজার টা অপরিনত মায়ের আর্তনাদের সাথে। শুধু থেকে যাবে নিয়ম, আর অমানবিক নিয়মে গড়া পৃথিবী!

আরও পড়ুন

Comments are closed.